বাজার করার এক্সপেরিমেন্টঃ নিঝুম ঠাকুর
টাউন বাজারৎ
বাজার করার এক্সপেরিমেন্ট
নিঝুম ঠাকুর
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'বাজার সফর সমগ্ৰ' পড়ার পর মনে হল উনি যেভাবে বাজার করতেন, আর বিক্রেতাদের নাম-ধাম যে কৌশলে জেনে নিতেন আমিও সেভাবে একবার চেষ্টা করে দেখি।
তিনি 'বাজার সফর সমগ্র'তে লিখেছেন 'খেতে জানলে তবেই বাজার ঠিকঠাক করা যায়।'
আমি দশ -বারো বছর বয়স থেকেই বাজার করি।
নিজের খাওয়ার মতো রান্নাও করতে পারি।
উনি বহু বাজার ঘুরেছেন, দেখেছেন বাজারের বিভিন্ন চরিত্র।
আর আমার তো সবেধন নীলমণি স্টেশন বাজার নামক এক ঠোঙায়।
তা স্টেশন বাজারে দীর্ঘদিন থেকে বাজার করছি।
বারো-তেরো বছর আগে স্টেশন বাজারের দক্ষিণ দিকে এক বিধবা মহিলা সব্জি নিয়ে বসেন। প্রথম যেদিন ঐ বিধবা মহিলার কাছে গেলাম কোনো দরদাম না করেই দুই-তিন রকমের সব্জি কিনলাম।
যা দাম বলল দিয়ে দিলাম। ওনার কাছে কেন জানি দরদাম করতে ইচ্ছে করে না। যা বলে তাই দিয়ে দি গরীব মানুষ তো! মজার ব্যাপার হলো কিছুদিন পর থেকে আমার কাছ থেকে সব্জির দাম অন্যান্য ক্রেতার থেকে কম নিতে লাগলেন আর ওজনেও একটু বেশী। একদিন জিজ্ঞেস করলাম - মাসি তুমি আমার থেকে সব্জির দাম অন্যদের থেকে কেন কম নাও আর ওজনেও বেশী দাও, তোমার লস্ হয়না?
তার উত্তরে মাসি বলল, 'তুই একমাত্র মানষি যে কখনও দাম জিগায় না। যা কঁও তাই দিয়া দিস।
তো মুইও তোকে দেখিম না তা হয় নাকি। যা দেঁসো লাভ রাখিই দেঁসো।'
মাঝখানে একদিন দেখি মাসি অন্যান্য সব্জির সাথে বিঘৎ সাইজের এক কাঁদি কাঁচা কলা আর দশ-বারো ফানা ছোট সাইজের কাঁচা কলা নিয়ে বসেছে। বড়ো গুলো ত্রিশ টাকা হালা আর ছোট গুলো কুড়ি টাকা হালা। বেশ কিছু খদ্দের বড়ো কাঁচা কলা গুলো ত্রিশ টাকায় দমাদ্দম কিনে ঝোলায় ভরছে। আমি বললাম আমাকেও বড়ো কলা এক হালা দাও।
মাসি বলল, ‘তুই অন্য বাজার করি আয়।’
বুঝলাম ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। অন্যান্য বাজার করে মাসির কাছে আসলাম। এখন খদ্দের নেই ।
মাসি বলল, 'তুই এই ছোট গুলান নে ।ছোট গুলানতে ভেজাল নাই। বড়ো গুলানতে কী করে জানিস? কলাগুলান যখন একটু ছোট হয়া আসে তখন মোচাখান কাটিয়া ওই কাটা জায়গৎ একটুকরা ন্যাকড়াৎ একমুঠা ইউরিয়া দিয়া বাঁধি থোয়।তিন-চার দিনৎ কলাগুলান সড়সড়াইয়া এতো বড়ো হয়া যায়।সেই জন্য তোরে কনু পরে আয়। তোকে মুই কোনো দিনও খারাপ জিনিস দিম না।'
মাসি আমাকে পরে আসতে বললে আমি বুঝে যাই কিছু ঘটু আছে ।ভিড় থাকলে তখন দাম নেয় না।
তা ভাবলাম এ হেন এই মাসিকেই আজকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেব ওর নাম-ধাম আর কোথা থেকে সব্জি আনে, কেমন দামে সব্জি কেনে কীভাবে স্টেশন বাজারে আসে।
তবে, মহিলাদের সরাসরি নাম জিজ্ঞেস করতে নেই।
একটু ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'মাসি আমি তো সাইকেল নিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরতে যাই,মন্ডল ঘাটও যাই তা তোমার বাড়ির ওদিক গেলে তোমার নাম কী বলব?
উত্তরে মাসি যা বলল তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
মাসি বলল, 'আমার নাম কাহয় না জানে।'
আমি থতমত খেয়ে বললাম, ‘তাহলে তোমার বাড়ি যাব কী করে?’
'মোর বাড়ি মন্ডলঘাটের দক্ষিণে এল লাইন ধরি এক মাইল গিলে দুই খান বটগাছ পড়িবে।একখান একটু আগৎ একখান একটু পাছৎ ,এই পাছৎ বটগাছখান ডিঙায় গিলে পড়িবে তিন খান বড়ো বড়ো বরইগাছ, সিটা পার করি যাহাকই জিগাইবেন উয়ায় মোর ঘর দিখাই দিবে। মোক সবায় না একডাকে চেনে।'
চিন্তায় পড়লাম, যার নাম কেউ জানে না তাকে একডাকে সবাই চেনে কী করে! সে যা হোক ওনাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম উনি প্রত্যেক দিন ভোর চারটায় উঠে হাঁটতে হাঁটতে মন্ডলঘাটে এসে পাইকারদের কাছ থেকে সব্জি কিনে টোটোতে সব্জি উঠিয়ে ঐ টোটোতেই স্টেশন বাজারে আসেন।কয়েকদিন আগেও ছোট মালটানা গাড়িতে আসতেন ।ওই গাড়িগুলো ধর্মঘট করায় এখন টোটোতেই আনতে হচ্ছে।ভাড়াও বেশী পড়ছে। আর ফোড়েদের জন্য মন্ডলঘাটে সব্জি কিনতে খুব ঝামেলা করতে হয়।
মাসির সাথে কথা বলছি এমন সময় পিঠে হাত পড়ায় ঘুরে দেখি পাকড়াশিবাবু।
পাকড়াশিবাবু বললেন, 'মঙ্গলময় লাইকে দেখলাম, আমার পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। যেন দেখতে পাননি এমন ভাব করলেন। যাক! আর মনে হয় আমাকে ঘাটাবে না।
ওনার 'গিরিশিরা' পত্রিকার জন্য একটা কবিতা লিখেছি। বেনামে। শালার ডালখোলার ঠিকানা দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি। কবিতাটা এইরকম।’
বলে বুক পকেট থেকে কাগজ বের করে শোনালেন।
‘জোব্বার পকেটে রেখেছি খৈনি
নাকের ফুটোয় রেখেছি হুঁকো,
চোখ দিয়ে টেনেছি চুরুট
বন্দুকের গুলি মেঘ ফুটো করে
নদীর জল শুকিয়ে দিল,
চলো পুঁইশাক তুলি
উল্টো রথে কেন সোজা রথ চলে?
সাবধানে পা ফেলো হে নাবালক।’
কবিতাটা আমাকে শুনিয়ে পাকড়াশিবাবু বললেন, 'কেমন হয়েছে?'
খুব ভালো লিখেছেন বললাম। আর মনে মনে বললাম-মঙ্গলময় লাই হারে নি, পাকড়াশিবাবুকে কবিতা ধরিয়ে ছেড়েছেন। কবিতা পাঠের আসরে ডাক পড়লো বলে!

Bhalo laaglo..
উত্তরমুছুনকবিতাটি মোক্ষম! মাসির নাম চেনার গুপ্ত সূত্র যেন!
উত্তরমুছুন