ছোটগল্পঃ শর্মিলার খোঁপা। সোমঋতা রায়।
শর্মিলার খোঁপা
সোমঋতা রায়
একটা খোঁপা পেল পান্তু সকালের ময়লা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে। একটা ফুল জড়ানো আস্ত খোঁপা। রাস্তায় পড়েছিল। প্রথমে ও গোবর ভেবেছিল, কিন্তু গোবর এমন চকচকে গ্ল্যামার ঝরানো হয় না কি! কুন্ডু বাড়িতে আগের রাতে বৌভাত ছিল। বাড়িতে বিয়ের গেট এখনও লাগানো আছে। আর সেই গেটের থেকে দুই পা দূরেই পড়েছিল ওই খোঁপাটা। ও যখন বুঝল গোবর নয়। তখন এক ঝলক মনে হয়েছিল কোনো মরা প্রাণী টানি নয়তো!? কিন্তু এমন ফুলের মালা লাগানো হবে কেন! ইতস্তত করে তুলে দেখেছিল। নাঃ চুল-ই। খোঁপা-ই! মেয়েদেরই! কিন্তু এমন মাঝ রাস্তায় কেন?
কোনো অতিথির খোঁপা না কি! কখন খুলে গেল? বিয়েবাড়িতে ঢোকার মুখে নাকি বেরোবার সময়? নিজেকে বেশ গোয়েন্দা গোয়েন্দা মনে হতে থাকল। একবার শুঁকে নিল সে পরচুলা খোঁপাটা। নাঃ, সুন্দর গন্ধই আছে। বড় ঘরের মেয়েরই হবে। হেব্বি ঠকাতে পারে কিন্তু এরা! মাথায় এত বড় একটা মিথ্যা বেঁধে কেমন ঘুরেও বেড়ায়! তারপর মনে হল, আচ্ছা এটা নতুন বউয়ের হবে না তো!? হয়তো বিয়ের রাতে বর দেখল চুলটা খাটো। রাগের মাথায় জানলা দিয়ে তাই খোঁপা ছুঁড়ে ফেলল! যাক গে যাক, বড়লোকদের ব্যাপারে ঢুকে কাজ নাই। মালটা কিন্তু ভালো বানিয়েছে। একদম সত্যির মতো। এরকম খোঁপা সে সিনেমায় দেখেছে। হেব্বি সুন্দর এক নায়িকার মাথায়। কি যেন নামটা! সেই যে মেয়েটা ট্রেনে জানলার ধারে বসেছিল। ছোট ট্রেন পাহাড় ঘুরে ঘুরে নামছিল। নায়ক ট্রেনের পাশে গাড়ি চালিয়ে গান করছিল!! মেয়েটা শুধু মুচকি মুচকি হাসছিল। তার মাথায় এরকম খোঁপা ছিল। সেটাও কি নকল নাকি? এসব ভাবতে ভাবতেই পান্তু চট করে বাসি ফুলের মালটা ময়লার গাড়িতে ফেলে দিয়ে খোঁপাটা ওর আলাদা প্লাস্টিকের থলেতে পুড়ে নিল। এই প্লাস্টিকের থলে ওর গাড়িতেই লাগানো থাকে, বিক্রি যোগ্য যা পায় নিজের থলেতে নিয়ে নেয়। এই খোঁপাটাও সে টুক করে সরিয়ে রাখল। কেউ দেখলো না তো!
সাত সকালে অবশ্য দেখার কেউ থাকে না। বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে বুক ব্যাথা হয়ে যায়, তাও বাবুদের ঘুম ভাঙে না। কিছু কিছু বাড়ির সামনে গিয়ে ‘ও বৌদি বৌদি!!’ করে চিল্লাতেও হয়। কেউ চোখ ডলতে ডলতে, কেউ হাই তুলতে তুলতে, কেউ বা গাল পাড়তে পাড়তে ময়লা দিতে আসে। পান্তু কিন্তু কারো বালতি ধরে না। নিজের ময়লা নিজে আনো, নিজে ফেলো। শুধু ডাক্তারের বউ দোতলার বারান্দা থেকে ময়লা ছুঁড়ে ফেলে। পান্তু বারবার বলেছে ওই ভাবে ময়লা না ছুঁড়তে। রাগ হয় ওর। একদিন পান্তু বলল, ‘আবার ময়লা ছুঁড়বা? নিব না!’
‘নে বাবা পান্তু, নিয়ে যা!’
‘না নিব না!’
ফটাস! উড়ন্ত ময়লা ভর্তি প্লাস্টিক এসে পড়ল গাড়িতে। প্লাস্টিকের ধাক্কায় আবার মদের বোতলের বাক্স ছিটকে পড়ল রাস্তায়। এক্কেবারে ডাক্তারের গেটের সামনে।
পান্তু কটমট করে সেই দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ আমি তুলব না বলে দিলাম।’
‘এই পান্তু, এমনি করিস না!’
পান্তু গাড়ি ঠেলে এগিয়ে যেতে থাকল। ডাক্তারের গিন্নি করুন চোখে তাকিয়ে একই কথা বলে যেতে থাকল। তার ছেলে তখন আবার ভুঁড়ি চুলকাতে চুলকাতে দাঁড়াল বারান্দায় এসে। পান্তু নিজের কথা আর রাখতে পারল না। বাক্সটা তুলে নিল। গিন্নিমা আরেকটু নেকু গলায় বললেন, ‘জানিসই তো আমার পায়ে ব্যাথা। নামতে পারি না!’
পান্তু সব বোঝে। ভালোমানুষ পেয়ে ওকে দিয়ে সব করিয়ে নেয়। তবে পান্তু কাউকে ভয় করে না। বাক্সটার দাম আছে তাই তুলে নিল। অন্য কিছু পড়লে বয়ে গেছিল ওর তুলতে!
আজকে পান্তুকে একটু চিন্তিত দেখল। একে তো নায়িকার নামটা পেটে এসেও মুখে আসছে না। তার উপর বিশাল রোদ উঠেছে এই সাত সকালে! খোঁপার চিন্তা ওর মাথায় কুটকুট করে যাচ্ছে। এটার দাম কত হবে? জিনিস তো ভালোই মনে হচ্ছে। কুদ্দুসদার দোকানে গিয়ে জিগেস করবে? ওরা তো কাটা চুল বেচে। নাকি ছেনুকে ধরবে। ও চুল ছেঁড়া নেয় পাড়ায় পাড়ায়। বাড়ির মেয়েদের যে চুল পড়ে, অনেকেই তা না ফেলে জমিয়ে রাখে। তারপর ছেনুর মতো লোকেদেরকে বাসনের বদলে বা টাকার বদলে সেই চুল দেয়। ছেনু বলেছে ওই সব চুলের অনেক দাম। পরচুলা হয় ওই চুল দিয়ে। মেলায় যে ঘোড়ার লেজের মতো পরচুলা বিক্রি হয় সেগুলা তো নকল। মানুষের আসল চুলের দাম নাকি অনেক। তাহলে এই খোঁপাটর দাম কেমন হবে? এই নকল খোঁপাটা কি আসল চুলের নাকি নকল চুলের!! থলেতে হাত ঢুকিয়ে খোঁপাতাকে একবার ধরে বোঝার চেষ্টা করে ও। তারপর আবার ওর গোঁয়ার গোবিন্দ গাড়িটাকে ঠেলতে থাকে। কবেকার গাড়ি কে জানে। মানুষ হলে এতদিনে মরে ভূত হয়ে যেত এ গাড়ি। পৌরসভা থেকে তাও নতুন গাড়ি দেয় না। পান্তুর খুব ইচ্ছে করে ও নতুন গাড়ি করে ময়লা নিতে আসবে। শার্টের উপরের দুটো তিনটে বোতাম খুলে রাখবে। বাঁশি বাজাবে পুঁ পুঁ, আর বেল বাজাবে টরিং টরিং। দত্ত বাড়ির সামনে এসে শুধু ‘বৌদি বৌদি’ বলবে। ব্যস। ওই গাড়িটাতে পান্তু লাল কাপড় বেঁধে রাখবে। ঠেকে বলবে, ‘নতুন গাড়ি হল বুঝলি!’ যখন নতুন গাড়িটা ঠেলে নিয়ে যাবে তখন আর নিজেকে বলদ বলদ লাগবে না।
আজ পান্তু দুই দিন বাদে ময়লা নিতে এসেছে তাই কথাও শুনতে হচ্ছে বেশি। এরা তো আবার এক দিন গাড়ি না এলেই রাস্তায় ময়লা ফেলে দেয়। নিজের বাড়ির সামনে কেউ ময়লা ফেলে না। অন্যের বাড়ির সামনে গিয়ে টুক করে ফেলে কেটে পড়ে। কেউ আবার কাজের লোককে দিয়ে ফেলায়। কেউ আবার সাইকেলে করে অন্য পাড়ায় ময়লা ফেলতে যায়। পান্তুর মনে হয় মানুষ আসলে শুয়ারের জাত। যেখানে থাকে সেখানেই হাগে মোতে। শুধু মানুষ হয়েছে বলে দুই পা দূরে গিয়ে ভাবে ‘এটা তো আর আমার বাড়ি নয়!’ মানুষ আসলেই উল্লুকেরও জাত!
রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা অবশ্য পান্তু তোলে না। ওই ময়লা তুলতে আসে হাবুলরা। চন্দনরা আসে ড্রেন কাটতে। মাঝে মাঝে তো এমন হয়, চন্দনরা ড্রেন কেটে ময়লা রাস্তায় রেখে গেল কিন্তু হাবুলরা তুলতে এল না। পান্তুও হয়তো আসেনি সেদিন। রাস্তায় ঘরের ময়লাও ফেলে গেল লোকে। রাতে হল বৃষ্টি। সব ময়লা আবার গিয়ে পড়ল ড্রেনে। রাস্তায় জল জমল। সবাই সবার পিন্ডি চটকালো। এই ভাবেই চলে এখানে সব। বিশেষত এই ওয়ার্ডে। পান্তুর অবশ্য দোষ নেই। ও টাকা পেলে আসে। টাকা না পেলে ভদ্দরলোকের পাড়া পরিষ্কারের দায় ওর নাই।
‘এই পান্তু, এদিকে আয়, বসে আছিস কেন!?’
‘আমরা কি ময়লা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব না কি!!’
অতিরিক্ত গরম তায় গাড়ির চাকা জ্যাম। পান্তু প্রথমপাড়ার গলিতে ঢুকে একটা বাড়ির সিঁড়িতে একটু বসেছিল। তাতেই সব কাঁইমাই জুড়েছে। পান্তু ঘাম মুছল, কে বলবে এখন আষাঢ় মাস। বৃষ্টি না হলে গরমে চাঁদি ফাটায় দিচ্ছে! তাও কাজ হল কাজ। পান্তু উঠে পড়ল। আজ কোনো বোতল বা বাক্স পায়নি ও। প্লাস্টিকের থলেতে খোঁপাটা শুধু দুলতে দুলতে চলল।
ময়লা দিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে ওর বারোটা বাজল প্রায়। ঘরে ঢুকে দেখল বিনির মা ভাত নামাচ্ছে। পট করে থলে থেকে খোঁপাটা বের করে বউয়ের মুখের সামনে দোলাতে দোলাতে বলল, ‘দ্যাখ কি আনছি!’
‘কী পেলি?! কী রে এটা?’ বলল বউ।
‘তোর লগে আনসি! পর দেখি!’
‘কী পর পর করিস? কী এটা?’
‘খোঁপা রে খোঁপা। হিরোইনরা পরে দেখিস নাই!’
‘না দেখি নাই। হিরোইনদের ইস্টেট চুল থাকে। খোঁপা থাকে নাকি?’
পান্তু একটু দমে গেল। বউয়ের কথাটা ভুল না। কিন্তু ও যেই মেয়েটাকে মাঝে মাঝেই ট্রেনের জানলায় বসে মুচকি মুচকি হাসতে দেখে তার তো এমনই খোঁপা থাকে মাথায়! সেও তো হিরোইনই বটে। পান্তু বলল, 'তোর জন্য আনলাম। এত কথা কি!'
‘আনতে বলসি আমি? কয়টা পেঁয়াজ আর লঙ্কা আনতে বলসিলাম না? কোথায়? চুল আনসে! চুল দিয়ে ভাত খাবা?’
‘কিছু নাই?!’
‘বলিনি নাই? যা নিয়ে আয়!’
‘আমি পারব না এখন। যা হয় দে।’
বিনির মা আর কিছু বলল না। গজ গজ করতে থাকল। পান্তু ভাবল নাপিতের দোকান থেকে ঘুরে এলেই ভালো হত। খোঁপাটা আবার সে থলেতে পুড়তে গেল।
‘ওটা রাখ। আমি নিব না বলসি নাকি? মনার বিয়াতে পরব। যা এখন গা ধো গে যা। ভাত দিব।’
পান্তু খোঁপাটাকে দুই বার হাত বুলিয়ে জানলার কাছে রেখে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তারপর গেল গোসল করতে। তার বেশ ভালোলাগলে থাকল। মনে মনে ও দেখে ফেলল মনার বিয়েতে বর যাত্রী যাচ্ছে ওরা। বিনির মা বাসে জানলার ধারে বসে আছে, লাল শাড়ি, লাল লিপিস্টিক আর মাথায় মস্ত খোঁপা। ঠিক যেন শর্মিলা ঠাকুর! আরে এই তো! এই তো নামটা মনে পড়ে গেল! মাথায় ঠান্ডা জল ঢালতে পারলে কত কিছুই না মনে পড়ে যায়!
কিন্তু ফেরার সময় এ কী দেখল পান্তু!! দেখল ছানাদার গরুর মাথায় কেউ একটা শর্মিলার ওই খোঁপা বেঁধে দিয়েছে। বস্তির ছেলে ছোকরার কারবার আর কি! জানলা দিয়ে নিশ্চই মাল সরিয়েছে! আর সেই গরু এখন মাথায় খোঁপা নিয়ে ঘাস খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন